প্রকাশিত: 5:24 AM, July 17, 2026
আব্দুল কুদ্দুস:- কুলাউড়া উপজেলায় অসম্পন্ন মনুনদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা। প্রকল্পের কাজ আংশিক শেষ হলেও এখনো বিভিন্ন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত। মনুনদীর অরক্ষিত এই প্রতিরক্ষা বাঁধকে ঘিরে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বিগ্নে রয়েছেন নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষ।
মনুনদী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ চলছে পাঁচ বছর ধরে। এর মাঝে গত দুই বছর ধরে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত চারটি অংশে সংস্কারকাজ করা সম্ভব হয়নি বিএসএফের বাঁধায়। এবারও বর্ষায় অরক্ষিত এই প্রতিরক্ষা বাঁধের কারণে নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন মনুপাড়ের মানুষ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন ও আকস্মিক বন্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলায় হাজার কোটি টাকার বাঁধ ও তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ অনেক স্থানে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই অঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও আতঙ্কে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী চারটি এলাকায় ভারতীয় বিএসএফের বাঁধায় বেড়িবাঁধের কাজ বন্ধ থাকায় আতঙ্কে মনু পাড়ের মানুষ। ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজে নির্ধারিত তিন বছর সময়ের মধ্যে সুফল মেলেনি। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি নানা সমস্যায়।
জান যায়, নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ তিন ভাগের দুই ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনা নির্ধারণ ও জমি অধিগ্রহণ, সীমান্তবর্তী এলাকাতে বিএসএফের বাঁধাসহ জটিল নানা প্রক্রিয়া সম্পাদনে কালক্ষেপণ হওয়ায় দেরি হচ্ছে বাঁধের কাজ। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে বয়ে আসা মনুনদীর অবস্থান ও প্রবেশ পথ সীমান্তবর্তী এলাকাতে হওয়ায় দুই দেশের নদী ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক নানা ইস্যুতে জটিলতাও গতি মন্থর করেছে বাঁধের কাজে।
২০২১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় এবারও বর্ষায় কুলাউড়া, রাজনগর, সদর উপজেলা বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা এলে মনু পাড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। এবারও কুলাউড়া উপজেলার নদী তীরবর্তী চারটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ রয়েছেন সবচেয় বেশি ঝুঁকিতে। গত ৮ জুলাই গভীর রাত থেকে মনু নদীতে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে নেমে আসা ঢলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকার বেড়িবাঁধের একটি সড়কে ২০২৪ সালে ভেঙে যাওয়া পুরাতন বাঁধ দিয়ে ফের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, আলীনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। সীমান্তবর্তী এরাকার রাস্তা, বসতবাড়ি, কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক গ্রামের শতাধিক পরিবার।
স্থানীয়রা জানান, মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে তারা নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। মানববন্ধন করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। তারপরও বিএসএফের বাঁধাসহ নানা কারণে ২০২১ সালে শুরু হওয়া মনু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। বিশেষ করে শিকড়িয়া, নিশিন্তপুর, তেলিবিল, দত্তগ্রাম এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সংস্কার কাজ আটকে থাকায় এবার বর্ষায়ও বাড়ছে বন্যার শঙ্কা।এরপরও বাঁধের কাজ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানা যাচ্ছে না।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বন্যা আর ভাঙন থেকে কুলাউড়া উপজেলাকে রক্ষা করতেই ২০২০-২১ অর্থ বছর থেকে ২৮টি প্যাকেজে ৩০৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এসব কাজের মধ্যে, প্রতিরক্ষামূলক কাজের ২০টি, চর অপসারণ কাজের ৪ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ কাজের ৪টি প্যাকেজের কাজ রয়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলায় কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।
পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, আলীনগর এবং গজভাগ এলাকার বাসিন্দাসহ ইউপি সদস্য তাহির আলী, স্থানীয় বাসিন্দা ফয়জুল হক, মখলিছ মিয়া জানান, মনুনদীর শিকড়িয়ার বেড়িবাঁধটি ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে বছর বাঁধের যে ১০০ ফুট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত সংস্কার করা হয়নি। কয়েকদিন অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে মনুনদীর বৃদ্ধি পাওয়া পানিতে সীমান্তবর্তী শিকড়িয়ার পুরাতন ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয় এলাকার মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে থেকে বিএসএফের বাঁধায় মনুনদীর শিকড়িয়া বেড়িবাঁধের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে চলাচলের জন্য স্থানীয়রা বাশেঁর সাকো তৈরি করেছেন। তাছাড়া রাজাপুর, বেলরতল, ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ঠিকাদারদের গড়িমসি, জমি অধিগ্রহণ ও সময়মতো অর্থের ছাড় না থাকায় কাজ বাস্তবায়নে বারবার বাধার সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দা।
তারা আরো বলেন, ২০২৪ সালের ২১ আগস্টের বন্যায় উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, টিলাগাঁও ইউনিয়নহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে ২০১৮ এবং ২০২২ সালে দুই দফা বন্যায়ও উপজেলার টিলাগাঁও, হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে প্রতিরক্ষা বাঁধ, নদী আর গ্রাম কোনোটির অস্তিত্ব থাকে না। সেই সঙ্গে এ ইউনিয়নগুলোর বানভাসি লোকজন প্রতিটি মুহূর্তে বন্যার আতঙ্কে দিন কাটায়।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, মনুনদী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নানা জটিলতার কারণে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারকাজ করতে গেলে সীমান্তবর্তী কিছু স্থানে বিএসএফের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এতে শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানে মোট ১ হাজার ৪০০ মিটার অংশের কাজ বন্ধ রয়েছে। এই স্থানে কাজ করার অনুমোতি চেয়ে ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশন ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে চিঠিও দিয়েছিল। দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। শিকড়িয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে আমাদের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, মনুনদীর বৃহৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে জেলা উন্নয়ন সভায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বিএসএফের বাঁধা নিরসনের জন্য সরকারের উর্ধতন পর্যায়ে জানানো হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া ও দত্তগ্রামে মনুনদীর বেড়িবাঁধের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটি ভরাটের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারকে বিজিবি সহযোগিতা করবে।
ছবি:- কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া এলাকার মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙা অংশে স্থানীয়দের সাঁকো নির্মাণ।


Published From
Positive International Inc,
73-16, Roosevelt Ave Floor 2, Jackson Heights, New York 11372.
Email : voiceofkulaura2@gmail.com
Chief Editor : Shafiq Chowdhury
Editor : Abdul Quayyum
Managing Editor : Nurul Islam Emon
Design and developed by positiveit.us