ঈদে মিলাদুন্নবী কি ও এর তাৎপর্য।

প্রকাশিত: 6:58 AM, August 25, 2026

ঈদে মিলাদুন্নবী কি ও এর তাৎপর্য।

ধর্ম ডেস্ক:- মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমনের দিনকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে পালিত একটি ধর্মীয় দিবস হলো ঈদে মিলাদুন্নবী। ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মকাল। সে হিসেবে ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম বা আগমনকে বোঝানো হয়।

 

মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে নানা ধর্মীয় কর্মসূচি পালন করা হয়।

 

তবে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের তারিখ, প্রচলন ও শরিয়তসম্মততা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) ‘হাতির বছর’ জন্মগ্রহণ করেন। আরব ইতিহাসে যে বছর ইয়েমেনের শাসক আবরাহা হাতি নিয়ে কাবা শরিফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মক্কা আক্রমণ করেছিলেন, সেই বছরকে ‘হাতির বছর’ বলা হয়।

 

ঐতিহাসিকদের মতে, এ ঘটনা আনুমানিক ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে ঘটেছিল। সাহাবি কায়স ইবনে মাখরামা (রা.)-এর বর্ণনা থেকেও মহানবী (সা.)-এর জন্মের বছর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে মহানবী (সা.)-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে পরবর্তী যুগের আলেম ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে তার জন্মতারিখ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে।

 

মুসলিম সমাজে প্রচলিত মত অনুযায়ী, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা হয়। তবে ১২ রবিউল আউয়ালই মহানবী (সা.)-এর জন্মতারিখ- এ বিষয়ে সর্বসম্মত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

 

ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস নিয়েও রয়েছে মতভেদ। ইসলামের প্রথম যুগে সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের সময়ে মহানবী (সা.)-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসব পালনের প্রমাণ পাওয়া যায় না বলে একদল আলেম মনে করেন।

 

ইতিহাসবিদ ও ফকিহদের একাংশের মতে, ইসলামের কয়েক শতাব্দী পর মাওলিদ বা মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের প্রচলন শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে ইরাকের আরবিলের শাসক মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরির নাম উল্লেখ করা হয়।

 

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি জাঁকজমকপূর্ণভাবে মাওলিদ অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের আয়োজন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

 

অন্যদিকে, অনেক আলেম মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর যুগ, সাহাবায়ে কেরাম এবং ইসলামের প্রথম যুগে এ ধরনের আয়োজনের প্রচলন না থাকায় এটিকে ধর্মীয় ইবাদত হিসেবে পালন করা উচিত নয়। নবম হিজরি শতকের আলেম ইবনে হাজর আল-আসকালানীসহ বিভিন্ন আলেম মাওলিদ পালনের প্রচলনকে পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

সহিহ হাদিসে মহানবী (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে সোমবার দিনের সম্পর্কের কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। হজরত আবু কাতাদাহ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘ওই দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং ওই দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ এ কারণে অনেক আলেম সোমবার নফল রোজা রাখাকে মহানবী (সা.)-এর জন্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুন্নতসম্মত পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ওই হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে বার্ষিক উৎসব পালনের কথা বলা হয়নি।

 

মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও হেদায়েতের বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। তার জীবন, চরিত্র, ন্যায়নীতি, মানবিকতা ও আদর্শ মুসলমানদের জন্য অনুসরণের প্রধান দৃষ্টান্ত। তাই মহানবী (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ সম্পর্কে আলোচনা, তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং তার আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকারকে এ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

 

মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে আরব সমাজে আগমন করেন, যখন সেখানে গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার ও নানা ধরনের অনাচার ছিল। তিনি তাওহিদ, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির শিক্ষা দেন। তার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ন্যায়, মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার শিক্ষা পাওয়া যায়।

 

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ কি না—এ নিয়েও মুসলিম আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর জন্মের আনন্দ প্রকাশ, তার জীবন ও চরিত্র আলোচনা এবং তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা বৈধ ও সওয়াবের কাজ হতে পারে, যদি এতে শরিয়তবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড না থাকে।

 

অন্যদিকে আরেকদল আলেমের মত হলো, নির্দিষ্ট তারিখে মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন ইসলামের প্রথম যুগে প্রচলিত ছিল না। তাই এটিকে ধর্মীয় ইবাদত বা বিশেষ উৎসব হিসেবে পালন করা শরিয়তসম্মত নয় বলে তারা মনে করেন।

 

ফলে ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলিম সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় হলেও এর প্রচলন ও পালনপদ্ধতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

 

তবে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ, সুন্নাহ, মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির শিক্ষা অনুসরণ করার গুরুত্ব নিয়ে দ্বিমত নেই। তার প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হতে পারে তার আদর্শকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা।