বালু খেকো দীপক দে’র যোগসাজশে মনু নদীর চর কেটে কোটি টাকার বালু লুট।

প্রকাশিত: ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

বালু খেকো দীপক দে’র যোগসাজশে মনু নদীর চর কেটে কোটি টাকার বালু লুট।
booked.net

আব্দুল কুদ্দুস:- প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কুলাউড়ার মনু নদীর চর কেটে বালু বিক্রির মহোৎসব চলছে। নদী তীরবর্তী এলাকার লোকদের অভিযোগ, কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা বালুখেকো দীপক দে’র মাধ্যমে মনুনদীর ধলিয়ার চর এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকার বালু রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জামিল ইকবাল নামে সিলেটের এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর সেতু সংলগ্ন ধলিয়ার চরে গিয়ে বালি নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। এতে বড় ধরণের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

 

জানা যায়, চলতি সনে মনু নদীর বালুমহাল ইজারা নেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুরী ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহমদের স্ত্রী নাজমুন নাহার লিপি। বিগত সময়ে কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা দীপক দে বালু মহালের ইজারাদার থাকলেও চলতি সনে তিনি ইজারাদার নন। কিন্তু বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপির সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি বালু মহালে একক আধিপত্য গড়ে তুলেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, গত বছর খানেক সময় ধরে মনু নদীর আলীনগর ও উপরিভাগ মৌজার ধলিয়া চর এলাকা থেকে প্রায় তিন কোটি টাকারও বেশি বালু চুরি করে বিক্রি করেছেন চিহ্নিত বালু খেকো দীপক দে ও জামিল ইকবাল নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সিনিয়র নেতাদের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যান দীপক দে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি বালু মহালে একক আধিপত্য বিস্তার করে অবৈধভাবে মনু নদীর ওপর নির্মিত রাজাপুর ও কটারকোনা সেতুর নিচ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। প্রশাসনের কয়েক দফা অভিযানে প্রায় দশ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হলেও ক্ষান্ত হননি বালু ব্যবসায়ী দীপক দে। অবাধে বড় বড় গাড়ি দিয়ে বালু পরিবহন করার কারণে নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

 

উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ফয়জুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েক বছর আগেও মনু নদীর এই চরজুড়ে বিভিন্ন সবজির চাষ হতো। কিন্তু এখন পুরো চরটি ক্ষতবিক্ষত করেছে বালু খেকোরা। রাজাপুর সেতুর দক্ষিণে ধলিয়ার চরে আলীনগর ও উপরিভাগ মৌজায় বিশাল বালুর চর রয়েছে। যেটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন অমান্য করে দিনরাত বিশাল চর থেকে দীপক দে’র নেতৃত্বে বালু সংযোগ সড়কের কাজসহ বিভিন্ন জায়গায় নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, নদী শাসন আইন না মেনে রাজাপুর সেতুর উভয়পাশের এক কিলোমিটারের ভেতর থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আমরা এলাকাবাসী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও রাজাপুর সেতু রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

 

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবালের ম্যানেজার আকাইদ হোসেন বলেন, আমরা বৈধভাবে বালু ক্রয় করে সড়কের কাজে ব্যবহার করছি। চলমান কাজের বালু সরবরাহকারী দীপক দে আমাদের বালু দিচ্ছেন। তিনি কিভাবে দিচ্ছেন সেটা আমাদের জানার বিষয় না। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বালু ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বালু বৈধ না অবৈধভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে তা বালু ব্যবসায়ী দীপক দে’র সাথে যোগাযোগ করুন। বিধি বহির্ভূত হলে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি দেখবে।

 

অভিযুক্ত বালু ব্যবসায়ী দীপক দে বলেন, আমি নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করছি কিন্তু অনেক সময় টাকার জন্য নিয়ম বহির্ভূত হয়ে যায়। কেউ এটা নিয়ে লেখালেখি করলে প্রশাসন এসে অভিযান করলে জরিমানা দিতে হয়। অবৈধভাবে মনু নদীর চরের বালু কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না হয়তো বা স্থানীয় কিছু জমির মালিকরা বালু অন্যত্র বিক্রি করছেন। ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দায় স্বীকার করে বলেন, আমি যদি রাজাপুর ব্রিজের নিচ থেকে বালু চুরি করে উত্তোলন করি তখন প্রশাসন আমাকে এসে হয়তো সাজা বা জরিমানা করবে এটাই নিয়ম। আর যদি হাতেনাতে ধরতে না পারে তাহলে তো আমি চুরি করে বেচে গেলাম। এটাই ব্যবসার নিয়ম।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, অনুমতি ছাড়া কোন অবস্থাতেই মনু নদীর চরের বালু অন্যত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবগত করা হয়েছে। এছাড়া জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু নদীর বিভিন্ন অংশের বালুমহাল জেলা প্রশাসন ইজারা থেকে ইজারা দেয়া হয়। ইজারার বাহিরে গিয়ে যদি নদী তীরবর্তী চর থেকে বালু উত্তোলন বা বিক্রি করা হয় তাহলে বিষয়টি উপজেলা ও জেলা প্রশাসন দেখবে।

 

ছবি:- কুলাউড়া মনু নদীর চর।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Ad

Follow for More!