রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বিশেষ ইবাদত

প্রকাশিত: ১০:২৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২১

রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বিশেষ ইবাদত

রমজান মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানবজাতির পথপ্রদর্শকরূপে এবং তা সত্য–মিথ্যা পার্থক্যকারী ও হিদায়েতের প্রমাণ। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।

কোরআনের ভাষায়, ‘লাইলাতুল কদর’ মর্যাদাপূর্ণ মহিমান্বিত রাত; ফারসিতে ‘শবে কদর’; যে রাতে পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন মহান আল্লাহ তাআলা।

 

মাহে রমজানের শেষ দশকের আমল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন : রমজান মাসের শেষ দর্শক শুরু হলেই রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর কোমর শক্ত করে বাঁধতেন, এই সময়ের রাত গুলোতে জাগ্রত থাকতেন এবং তাঁর গৃহবাসী লোকদেরকে সজাগ করতেন। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

 

আর বায়হাকী : শুয়াবুল ঈমান গ্রন্থে হযতর আনার্স (রা:) বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন : যখন কদর রাত্রি আসে, তখন হযরত জিব্রাঈল (আ:) ফিরিশতাদের বিরাট বাহিনী সমভিব্যাহারে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন এবং দাঁড়িয়ে কিংবা বসে আল্লাহর জিকির ও ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকা প্রত্যেক বান্দাহর জন্য রহমতের দোয়া করেন।

 

এই হাদীস হতে কদর, রাত্রির মর্যাদা এবং এই রাত্রিতে ইবাদত বন্দেগী, কুরআন তিলাওয়ার নফল নামাজ ও ইসলামী আলোচনা ও জ্ঞান চর্চার মর্যাদা স্পষ্টভাবে জানতে পারা যায়।

 

মহামারি করোনায় ঘরে কিংবা মসজিদে অবস্থানকারী রোজাদার মুমিন মুসলমানের জন্য রমজানের শেষ ১০ দিনের ইবাদত-বন্দেগির বিশেষ কিছু ইবাদত ও উপায় তুলে ধরা হলো-

 

শেষ দশকে ইতিকাফ করার কথা বলা হয়েছে। যদিও বছরের যেকোনো সময় ইতিকাফ করা যায়। তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের ফজিলত ভিন্ন। এটা মহানবী সা, এর প্রিয় সুন্নাত।

 

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবী করীম (সা.) ইতিকাফ করতেন। (বুখারী, হাদীস নং ২৪৯)

 

বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে ইবাদাত
শেষ দশকের প্রতিটি রাতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া ও ইসতেগফারে কাটিয়ে দেয়া। বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের দোয়া নামে পরিচিত দোয়াটি পড়া। যে দোয়াটি বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে শিখিয়েছেন। আর তাহলো-
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’

 

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

 

– সঠিকভাবে লাইলাতুল কদর তালাশ করা
রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে থাকা। কারণ লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতের ইবাদাত হাজার মাসের ইবাদাতের সমান।

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের রাতে বিশ্বাস ও পুরস্কারের আশায় ইবাদাতরত অবস্থায় থাকবে, আল্লাহ তাআলা তার অতিতের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ (বুখারি)

 

– দোয়ার একটি সূচি তৈরি করে নেয়া
শেষ দশকের বিজোড় রাতে আল্লাহর কাছে ন্যায়ের পথে চলা এবং অন্যায় পথ থেকে বিরত থাকতে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য তথা নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে একটি তালিকা তৈরি করে সদা মনে জাগ্রত রাখা। বিশেষ করে কুরআনে বর্ণিত ক্ষমা প্রার্থনার দোয়াগুলো সেজদা ও তাশাহহুদে পড়ার চেষ্টা করা।

– রাতের ইবাদতের জন্য দিনে ঘুমানো
রমজানের শেষ দশ দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটুও ঘুমাননি। তিনি সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তাই দিনের বেলায় কিছু সময় ঘুমিয়ে নেয়া। রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে থেকে লাইলাতুল কদর পাওয়ার চেষ্টা করা।

 

– অযথা সময় ব্যয় না করা
কোনো কারণ বা প্রয়োজণ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইলেক্ট্রনিক্স মাধ্যমসহ সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় বয় না করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকরেও তা যেন হয় ইবাদতের উৎস। তাই ইবাদত বন্দেগিতেই বেশি সময় ব্যয় করা। ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।

– বেশি বেশি কুরআন তেলওয়াত করা
শেষ দশকে কুরআন তেলাওয়াত ও এর মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা। কেননা কুরআনের অধ্যয়নেই সাওয়াব ও ফজিত বেশি। তাতে সুযোগ না থাকলে শুধু তেলাওয়াতেও রয়েছে অনেক সাওয়াব ও ফজিলত। তাই বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা।

 

– ধের্য্য মাধ্যমে ইবাদাত করা
বছরের ১১ মাস ২০ দিন অপেক্ষার পর আসে রমজানের শেষ দশক। এ দশকে মুমিন মুসলমান হাজার বছরের সেরা রাত ‘লাইলাতুল কদর’ তালাশে অপেক্ষমান। তাই ধৈর্যসহ এ রাতের তালাশ করা। এ দশ দিন কোনোভাবেই অধৈর্য হওয়া যাবে না। রমজানের এ শেষ দশকের প্রতিটি রাতই নিজের জীবনের জন্য চূড়ান্ত সময় ভেবে ধৈর্য সহকারে ইবাদাত-বন্দেগিতে মনোযোগী হওয়া। এ কথা মনে করে ইবাদাত করা যে, এ রমজানের শেষ দশকই হয়তো জীবনের শেষ দশক।

 

– ‌অসহায়দের দান করা
শেষ দশকের রাতে নামাজ, জিকির-আজকার, তেলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের পাশাপাশি যারা ইতেকাফে বসে না তাদের জন্য গরিব-দুঃখীর মাঝে আল্লাহর ওয়াস্তে দান-খয়রাত করা। ইয়াতিম মিসকিনদের সাধ্যানুযায়ী সহায়তা করায় রয়েছে অনেক সাওয়াব। আর তা যদি হয় লাইলাতুর কদরে তবে সে দানের হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ দানে পরিণত হবে।

 

– অন্যকে ইবাদাতে অনুপ্রাণিত করা
রমজানের শেষ দশকে ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, মা-বাব, ভাই-বোন, পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও বন্ধু বান্ধবদের রাতে ইবাদত বন্দেগিতে নিয়োজিত হওয়ার পরামর্শ দেয়া। তাদের সঙ্গে ইবাদতের প্রতিযোগিতায় নামার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সবাইকে লাইলাতুল কদর প্রাপ্তি অনুপ্রাণিত করে তোলা।

 

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লাইলাতুল কদর প্রাপ্তিতে ইবাদাত-বন্দেগি করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।